UnishKuri
web-to-new-banner.jpg

বিষ

অতনু বন্দ্যোপাধ্যায়

খবরটা শুনেই চমকে গিয়েছিলাম। এও হতে পারে! অরিন্দম বলে উঠল, “আমিও বিশ্বাস করতে পারিনি প্রথমে। যাই হোক শোন, সায়ন তোর ফোন নাম্বারটা হারিয়ে ফেলেছে। পারলে ওকে একবার ফোন করিস। তবে সামলে কিন্তু।”
“সামলে মানে?”
“সেটা তোকেই বুঝে নিতে হবে,” একটু হেসে বলল অরিন্দম।
কিন্তু-কিন্তু করেও ফোন করলাম পরের দিন সন্ধেবেলা।
“হ্যালো, কাকে চাইছেন?” একটু বয়স্ক মহিলার গলা।
“সায়ন আছে? ওকে বলুন অপূর্ব ফোন করেছে, বেলেঘাটার অপূর্ব সান্যাল।”
“একটু ধরুন, দেখছি।”
ঠক করে শব্দ করে ফোনটা টেব্লে বসে পড়ল মনে হল। ফোনের কালো সুড়ঙ্গ জুড়ে তীব্র নিস্তব্ধতা। সায়নের সঙ্গে কথা হবে আবার বছর দু’য়েক পরে। অথচ একটা সময় রোজ আড্ডা না হলে অপূর্ণ লাগত। ছেঁড়া-ছেঁড়া কোলাজের মতো স্মৃতিগুলো মনের মধ্যে ভেসে বেড়াচ্ছিল উদ্দেশ্যহীনভাবে। হঠাত্‌ চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই দিনটা, বছর তিনেক আগে… সেন্ট্রাল পার্কে। সায়ন সেদিন আমাকে আসতে বলেছিল ‘বিশেষ সেই জনের’ সঙ্গে আলাপ করাতে। আমি অপেক্ষা করছিলাম পার্কের সামনে বিকেলের পড়ন্ত আলোয়। খানিক পরে সায়নের সঙ্গে ট্যাক্সি করে যাকে নামতে দেখলাম,তাকে দেখে আমার তো আক্কেল গুড়ুম। এত সুন্দরী মেয়ে সায়নের প্রেমিকা! সায়নের চওড়া কপালের উপর যেন খানিকটা ঈর্ষাও ছুড়ে দিলাম।
“অপূর্ব, এ হল শ্রাবন্তী। আন্দাজ করতে পেরেছিস নিশ্চয়ই,” সায়নের মুখে গর্বের হাসি। হবে না? পিঠ অবধি ঝরে পড়া শান্ত চুল, টুকটুকে ফরসা মুখে আলতো গোলাপি রং ছড়ানো, মন ভুলিয়ে দেওয়া একমুখ ঝকঝকে হাসি, এমন নারী জীবনে এসে গেলে কোন পুরুষেরই না গর্ব হয়?
“শ্রাবন্তী, এ হল…” সায়নকে বাকিটুকু আর বলতে না দিয়ে ঝলমলিয়ে হেসে মেয়েটি বলল, “থাক আর বলতে হবে না, বুঝেছি। অরিন্দমের ভাষায় আঁতেল ত্রয়ীর একজন, তাই তো?”
কথাটা শুনে খুব মজা পেলাম।
বছরকয়েক আগে ক্রিসমাসের রাতে এক পাবে পঞ্চম রাউন্ড চিল্ড বিয়ার টানতে-টানতে অরিন্দম মুখ বেঁকিয়ে বলছিল, “বুইলি আমরা হলাম আঁতেল ত্রয়ী। মুখে মারিতং বিশ্ব। আসলে হচ্ছে না কিস্সুই। আমি ভেবেছিলাম, ম্যাথামেটিক্স নিয়ে অক্সফোর্ডে গিয়ে পড়ব, অনেক রিসার্চ করব আর দ্যাখ? হয়ে গিয়েছি পাতি দালাল। বেচে যাচ্ছি যা পারছি তাই। শালা নিজেকেও বোধ হয় বেচে দেব এবার… কোথায় শালা ম্যাথামেটিক্স!”
আমি তখন বেশ আলুথালু। জড়িয়ে-জড়িয়ে ঘাড় নাড়িয়ে বলেছিলাম, “ঠিক-ঠিক কোথায় ভেবেছিলাম গল্প লিখে জীবন কাটাব আর দ্যাখ শালা হয়ে গিয়েছি সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। চরকির মতো ঘুরে বেড়াচ্ছি আর চব্বিশ ঘণ্টা শুধু কাজ আর কাজ… লেখা-টেখা সব হাওয়া হয়ে গিয়েছে।”
সায়ন কিছু বলেনি, কেবল করে দেখিয়েছিল। ঢাকার ধানমন্ডির ছেলে সায়নের রক্তে ব্যবসা খলবল করে ফুটত। ঢাকায় ওর বাবার কাপড়ের কারখানা ছিল। সায়ন কিন্তু ঢাকায় থাকতে চায়নি, কলকাতায় লেখাপড়া করতে এসেছিল ইতিহাস নিয়ে। আমাদের তিনজনের মধ্যে নানা বিষয়ে ভাবনা ও বক্তব্য ওর সবচেয়ে বেশি ছিল। মাস্টার্সে ঈর্ষণীয় রেজ়াল্ট করে ও নাম লেখাল ব্যবসার দুনিয়ায়, অ্যাড এজেন্সির ব্যবসায়। আমাদের তিন বন্ধুর মধ্যে একমাত্র ওই চেয়েছিল ওর স্বপ্নকে জাপটে ধরে বাঁচতে।
“হ্যালো,” ওপাশে সায়নের গলা।
বছরদু’য়েক অনসাইটে ইতালিতে কাটিয়ে সবে কলকাতায় ফিরেছি। এই দু’বছরে সায়নের সঙ্গে প্রায় কথাবার্তাই হয়নি। ও আবার ফেসবুকেও অ্যাকাউন্ট খোলেনি। ফলে ওর সঙ্গে যোগাযোগটাই চলে গিয়েছিল। বছরখানেক আগে অবশ্য নিউ ইয়ার উইশ করতে একবার ফোন করেছিলাম, কিন্তু ছেঁড়া-ছেঁড়া কথাবার্তা শুনে বুঝতে পারছিলাম ও আমাকে এড়িয়ে যেতে চাইছে। আমার অভিমানও হয়েছিল।
“অপূর্ব বলছি রে,” বললাম।
“ওরে বাস! আইটির গ্লোবট্রটারের ফোন এখানে? তা অ্যাদ্দিন পরে? কী মনে করে স্যার?” সায়নের কথায় তীব্র হুল।
“এরকম করে বলছিস কেন? আমি তো ফোন করেছিলাম। তুইই তো পাত্তা দিসনি,” বললাম।
“তাই নাকি? আমিও পারি এসব? আমি তো দেখেছি, আমাকে ছেড়েই লোকেরা সব দূরে চলে যায়,” ও বলল।
এ কথার উত্তরই নেই আমার কাছে, চুপ করে রইলাম। অরিন্দমের কাছে শুনেছি খানিকটা। বছরখানেক আগে শ্রাবন্তী ওকে ছেড়ে চলে গিয়েছে। ওদের ডিভোর্সও হয়ে গিয়েছে মাসছয়েক। বিয়ের পর ঝড়ের আঘাতের মতো আলুথালু হয়ে গিয়েছে ওর জীবন।
“তোর খবর বল? কেমন আছিস?” জিজ্ঞাসা করলাম।
“কেমন আবার থাকব বল তো? শুনেছিস নিশ্চয়ই অরিন্দমের কাছ থেকে। একমাত্র ও শালাই তো আমার খোঁজ নেয় মাঝে-মাঝে। অবশ্য সাধে কী আর নেয়? সব জানি, জেলাসি বুঝলি। আমার সঙ্গে পাল্লা দেয় ও। আর তোর কথা ছাড়! তুই তো যোগাযোগই করলি না।”
বুঝতে পারছিলাম, ওর অনেক অভিমান জমে আছে আমার উপরেও। কিন্তু আমারও কী নেই? এই এত কিছু হয়ে গিয়েছে এ ক’বছরে, অরিন্দম বলেওনি আমাকে।
“কেন বলিসনি এসব?” আমি অরিন্দমকে জিজ্ঞেস করাতে ও বলেছিল, “দ্যাখ, ব্যাপারটার সত্যি-মিথ্যে তো জানি না। আমি কেবল সায়নের কথা শুনে তোকে এসব বলতে চাইনি। শ্রাবন্তী কী করে এত পালটে যেতে পারে, এটা ভাবতে পারি না আমি।”
আমি বুঝতে পারছিলাম ওর কথা। চিরদিনই বিতর্কের গন্ধ পেলে সে পথে যায় না ও।
“এসব কথা ছাড় না। শরীর এখন কেমন? বললাম সায়নকে।
“এই তো ফিরলাম সিঙ্গাপুর থেকে। ওখানকার ডাক্তাররা বলল, সারা শরীরে এখনও অনেক বিষ জমে আছে। বেরতে সময় লাগবে।”
আমি মনে-মনে হাসলাম। ভাবলাম, মনে যে বিষ জমে আছে, তা কদ্দিনে বেরবে? কোনও ডাক্তার কি জানে? সায়নের গলায় উদাসীনতা।
ছ্যাঁত করে উঠল বুকটা। অরিন্দম আমাকে শুধু উপর-উপর বলেছে পুরো ব্যাপারটা, বিষের ব্যাপারটাও। বিয়ের মাসছয়েকের মধ্যেই শ্রাবন্তী নাকি জড়িয়ে পড়েছিল সায়নের কোম্পানির অ্যাকাউন্ট্যান্ট দেবোপমের সঙ্গে। সায়ন নাকি বুঝতেই পারেনি, শ্রাবন্তী ওকে ধাপ্পা দিচ্ছে, ওরা রীতিমতো শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছে। ব্যাপারটা ধরা পড়ে আচমকা এক দুপুরে, সায়ন বাংলাদেশ টুর থেকে ফিরে আসায়। সায়ন সারপ্রাইজ় দিতে চেয়েছিল শ্রাবন্তীকে। তাই দেড় কোটি টাকার ডিলের খবরটা চেপে রেখেছিল। ঢাকায় ডিলটা নিশ্চিত করে উড়ে এসেছিল কলকাতায়। দুপুরে যখন ফ্ল্যাটে ফিরে এল, দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে গেল সবকিছু। ধরা পড়া অপরাধীর মতো দেবোপমের চোখ-মুখ, অবিন্যস্ত বিছানা, জোর করে স্বাভাবিক হতে চাওয়া শ্রাবন্তী… সব মিলিয়ে ছবিটা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল সায়নের কাছে।
“সায়ন একটা কথা জানতে খুব ইচ্ছে করে।”
“বল।”
“তুই কোনওদিন শ্রাবন্তীকে জিজ্ঞেস করেছিস, ও কেন এরকম করল?”
“ধুর বোকা, এটা এভাবে বলা যায়? মানুষের মন তো, তবে জিজ্ঞাসা করেছিলাম আমি। সেদিন রাতেই, যেদিন প্রথম জানতে পেরেছিলাম, আমার ভালবাসা অন্য কেউ এসে নিয়ে চলে গিয়েছে। দুমড়ে-মুচড়ে ভোগ করেছে। জিজ্ঞেস করেছিলাম, কেন? কী কমতি আছে আমার?
পেয়েছিলাম ভয়ঙ্কর সে উত্তর। ও বলেছিল, ওর শরীর আর মনের সবটুকু অধিকার ওর নিজের। যা খুশি করতে পারে ও নিজেকে নিয়ে। এ ব্যাপারে আমি নাকি ওকে বাধা দিতে পারি না। ভাব একবার অপূর্ব, যে আমি কোনওদিন মুখ তুলে অন্য কারওর দিকে তাকালাম না, যে আমি ভালবাসা ছাড়া কোনও সম্পর্কে বিশ্বাসই করলাম না, সেই আমার জীবনে ভালবাসার নারী এসে এমন কথা বলছে! মরে যেতে ইচ্ছে করেছিল সেদিন।”
“কিন্তু এটা তো আইনের চোখেও অন্যায়। তুই ওর বিরুদ্ধে আইনের কাছে গেলি না?”
“অপূর্ব একদিন আমি ওকে ভালবেসে বিয়ে করেছিলাম। আমরা অনেকটা সময় ভালবাসায় কাটিয়েছিলাম রে। কী করে ওর বিরুদ্ধে কোর্টে কেস করি বল তো? তা ছাড়া আমি একটা ভাল বাড়ির ছেলে, এসব শিক্ষা ছোট থেকে পাইনি তো। আমি চেষ্টা করেছিলাম, ওকে ফিরিয়ে আনার, অনেক বুঝিয়েছিলাম। কিন্তু ও তো তখন অন্ধ। দেবোপমের প্রেমে পাগল। আমি মেনে নিচ্ছি, মানুষের মনের কোনও তল নেই। হতে পারে, আমার মধ্যে ও আর প্রেম খুঁজে পাচ্ছিল না। কিন্তু তাই বলে যে মানুষটা ওকে এত ভালবাসল, সেই মানুষটাকে নতুন প্রেমিকের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে বিষ খাওয়াবে?”
“এটা কি ঠিক বলছিস তুই? কিছু ভুল হয়ে যাচ্ছে না তো? এটা হতে পারে?”
“অপূর্ব এটাই আমার জীবনের সত্যি। আমাকে স্লো পয়জ়নিং করে মারতে চেয়েছিল ওরা। ভাবতে পারিস? ভাবতে পারিস, আমাকে শারীরিকভাবে দুর্বল করে আমার সম্পত্তি নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে দু’জন? আজও আমি অনেক কিছুর হিসেব পাই না। আমার কোম্পানির অনেক বিশ্বাসী লোককে ওরা দু’জনে মিলে তাড়িয়ে দিয়েছে। বিয়ের আগে আমার যা সম্পত্তি ছিল, তার সেভেন্টি পারসেন্ট ও হাতিয়ে নিয়ে আমায় ছেড়ে চলে গিয়েছে।”
“এটা তো ভাবতেই পারছি না।”
“আরে আমি কি কোনওদিন ভেবেছি, আমাদের সম্পর্ক বিয়ের বছরখানেকের মধ্যে এরকম হয়ে যাবে? বিয়ের মাসদু’য়েকের মধ্যে একই দিনে দু’টো গাড়ি কিনেছিলাম, একটা সবুজ, একটা সাদা। সবুজটা ওর, ও ওটা নিয়ে গিয়েছে। ওর নামে একটা ফ্ল্যাট কিনেছিলাম রাজারহাটে, ওটা নিয়ে গিয়েছে। কল্যাণীতে কয়েকবিঘা জমি ওর নামে করেছিলাম। সব নিয়ে গিয়েছে। আর অ্যাকাউন্ট থেকে ওরা দু’জনে মিলে কীভাবে যে টাকাগুলো নয়ছয় করেছে, কী আর বলব! আমি হেরে গিয়েছি রে অপূর্ব। একদম হেরে গিয়েছি! চিরদিন ঘেন্না করতাম হেরে যাওয়াকে। কিন্তু হেরে গেলাম জীবনের কাছে।”
“তা কেন বলছিস? আবার নতুন করে ভাবতে পারিস তো। নতুন করে শুরু কর। ব্যবসা, সম্পর্ক… তুই পারবিই।”
“আত্মবিশ্বাসটাই আর খুঁজে পাচ্ছি না রে বন্ধু! মনে হচ্ছে, এই দু’বছরে আমার সবকিছু হারিয়ে গেল। ঈশ্বর আমাকে বুকের পাটা অনেক চওড়া দিয়েছিলেন। আত্মবিশ্বাসে কোনও ঘাটতি ছিল না, নিজেকে অন্যদের চেয়ে অনেক উপরেই ভাবতাম। বিশ্বাস ছিল যে, আমার সংস্পর্শে এলে যে কোনও কারওর উপরে আমার প্রভাব পড়তে বাধ্য। অথচ দ্যাখ, শ্রাবন্তী কেমন পালটে গেল? আমার সঙ্গে এতদিন থেকেও আমাকে ধোঁকা দিয়ে চলে গেল। এটা আমার পৌরুষে লাগে রে। মনে হয়, আমি ওকে রাখতে পারলাম না বলেই, একটা ছিঁচকে চোর এসে ওকে নিয়ে চলে গেল। আমি নিজের কাছে হেরে গেলাম। আমার আত্মবিশ্বাস ভেঙে চুরমার হয়ে গেল নিজের ব্যাপারে। আগের মতো নিজেকে নিয়ে অহঙ্কার করার সাহসই পাই না। তা হলে কোথা থেকে শুরু করব বল? তার উপর বিষের ধকলে শরীরটা ঝাঁজরা হয়ে গিয়েছে। সিঙ্গাপুরে ডাক্তার এমন মেডিসিন দিয়েছে, পনেরো মিনিট পরপর ডায়াবেটিস রোগীর মতো বাথরুম দৌড়তে হয়। আগের শক্তিটাও নেই ধকল নেওয়ার। তারপর বিজ়নেসেও প্রচুর ড্যামেজ হয়ে গিয়েছে। সেসব সারিয়ে উঠতে পারব কি না, সেই ভরসাটাই পাই না আর।”
“বিজ়নেসে ক্ষতি হয়েছে? তোর কাস্টমারদের সঙ্গে চিরকালই তো ভাল র্যাপো ছিল?”
“শ্রাবন্তী আমায় শেষ করে দিয়েছে রে। আমার বিজ়নেস পার্টনার হিসেবে ওকে আলাপ করিয়ে দিতাম বড়-বড় কাস্টমারদের সঙ্গে। পলিটিক্যাল অনেক বড়-বড় নেতার সঙ্গেও আমার ভালই আলাপ ছিল। কিন্তু আমাকে ছেড়ে দেওয়ার আগে সবাইকে আমার নামে বদনাম করে এসেছে। আমি মুখ দেখাতে পারি না অনেককে। সুন্দরী মেয়ের কান্নায় ভিজে যায় বেশিরভাগ লোকই, জানিস তো। অনেক কাস্টমার আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছে।”
“ও কি দেবোপমকে বিয়ে করেছে?”
“তাই করে রে? আরে যেমন ওই মাকাল ফলটা, তেমনই শ্রাবন্তী। দেবোপম শ্রাবন্তীকে চুষে খেয়ে টাকাপয়সা হাতিয়ে কেটে পড়েছে। অবশ্য শ্রাবন্তীও ওরকমই, ও চান্স দিয়েছে। দেবোপমের সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ার পর আরও কয়েকটাকে নাচিয়ে এখন শুনলাম, ব্যাঙ্কে চাকরি করা একটা বুড়োকে ধরেছে।”
“কিন্তু শ্রাবন্তীকে বুঝতে তুই ভুল করলি?”
“আমি জানি না অপূর্ব। তবে ও এরকম ছিল না রে। হঠাত্‌ই বদলে গেল!”
ঠিক এই সময় শুনতে পেলাম বয়স্ক সেই মহিলার গলা, পাশ থেকে বলল, “খাবি না, সময় হয়ে গিয়েছে তো?” সায়ন বলল, “হ্যাঁ, পিসি আসছি।”
“তা হলে আজ রাখি? পরে কথা হবে।”
“হ্যাঁ রে, পিসি খেতে ডাকছে। বাড়িতে উনিই থাকেন। আমার তো আবার সব কিছু ডাক্তারের নিয়মে চলে। একদিন আসিস, কথা হবে।”
“আচ্ছা আসব, ভাল থাকিস।”
ফোনটা রেখে ভাবছিলাম কী অদ্ভুত আমাদের জীবন! কী অদ্ভুত আশপাশের সম্পর্কের সমীকরণ। কে কখন বদলে যাবে, কেন বদলে যাবে, কিছুরই যেন তল পাওয়ার উপায় নেই।
মাসখানেক পরের কথা। চেক জমা দিতে সল্টলেকে একটা প্রাইভেট ব্যাঙ্কে ঢুকেছি। একটা চেনা-চেনা কণ্ঠস্বর মনে হতেই তাকালাম সেদিকে। এ কী, এ যে শ্রাবন্তী! সামনে বসে থাকা একজনের সঙ্গে কথাবার্তায় ব্যস্ত। সেই একইরকম সুন্দরী। ঘিয়ে রংয়ের শাড়িতে সুতোর কাজ সারা শরীর জুড়ে। ঝকঝকে লাগছে ওকে। গিয়ে দাঁড়ালাম ওর সামনে।
“চিনতে পারছ?”
আমাকে দেখে খানিকটা চমকেই গেল যেন ও। হাসি-হাসি মুখটা ক্ষণিকের জন্য গম্ভীরও হয়ে গেল। বলল, “একটু বসো, আমি এনাকে ব্রিফ করে আসছি।”
আমি লাইনে দাঁড়িয়ে চেক জমা দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।
চেক জমা করে যখন সবে চেয়ারে আবার এসে বসব, দেখলাম সামনে শ্রাবন্তী।
“চলো ওই সামনের কফি শপটায় বসি,” বলে আঙুল তুলে রাস্তার উলটোদিকে দেখাল।
আমরা রাস্তা পেরিয়ে ঢুকলাম ওখানে। দু’টো কফি অর্ডার দিয়ে ও বলে উঠল, “তারপর, কেমন আছ? অনেকদিন দেশে ছিলে না তো? ফিরলে কবে?”
“এই মাসখানেক। তুমি হুট করে আমার সঙ্গে বেরিয়ে এলে, অসুবিধে নেই তো?”
“না, আসলে ওখানে বসে কথা বলা যেত না।”
কফি এসে গেল। কীভাবে শুরু করব বুঝতে পারছিলাম না খানিকক্ষণ। তারপর জড়তা কাটিয়ে বলেই ফেললাম, “কলকাতায় ফিরেই সব শুনলাম। তোমাদের রিলেশনশিপটা এভাবে ভেঙে যাবে ভাবতেও পারিনি।”
শ্রাবন্তীর মুখে যেন বিষণ্ণতার ছোঁয়া। “আমিও ভাবতে পারিনি অপূর্ব,” বলে উঠল ও।
“মানে? আমি তো শুনেছি তুমিই ওকে ডিচ করেছ। ওকে ইউজ় করেছ? অন্তত সায়ন আমাকে তাই বলেছে,” বেরিয়ে গেল মুখ থেকে কড়া-কড়া কথাগুলো, হঠাত্‌ই।
ম্লান হাসল শ্রাবন্তী, “পুরোটা তুমি বিশ্বাস করে ফেললে তাই না? তুমিও তো একদিন আমার বন্ধু ছিলে। তোমরা পুরুষরা না বেসিক্যালি এইরকমই হও। কোনও একটা ইসু পেলে মেয়েদের বিরুদ্ধে একজোট হয়ে যাও।”
“এটা কী বলছ? তুমি কি বলতে চাইছ সায়ন মিথ্যে বলেছে? ও তো তোমাকে ভালবাসত শ্রাবন্তী।”
“সায়ন মিথ্যে বলছে না অপূর্ব। কিন্তু সত্যিটাও চেপে যাচ্ছে। আমাকে বদনাম করছে সত্যিটা চেপে। ভালমানুষি দেখিয়ে আমাকে নিচু করে দিচ্ছে সমাজে।”
“মানে?”
“কী বলি বলো তো? আচ্ছা বেশ, খুলেই বলি তা হলে। আচ্ছা, তুমি কি জানো তোমার বন্ধু অনেক বড়-বড় মিথ্যে বলে, আমাকে বিয়ে করেছে? আমাকে বলেছিল, বিয়ের আগে যৌনতায় নাকি ও বিশ্বাস করে না। ভালবাসাটাই আসল, শরীর তো সামান্য ব্যাপার, আসল হল মন। এরকম আরও অনেক বড়-বড় তত্ত্ব। আমিও বিশ্বাস করেছিলাম বোকার মতো। কিন্তু বিয়ের পরে দেখলাম, এসব ওর কেতাবি কথা। আসল ব্যাপার হল, ও বিছানায় একেবারেই অচল, আর সেটা ও জানত। সে জন্যই ভালমানুষির অভিনয় করত বড়-বড় কথা বলে। জানতে এটা তুমি?”
“কী বলছ শ্রাবন্তী?”
“এমন মানুষকে আমি যদি বলি, তুমি আমাকে ঠকিয়েছ। আমাকে ডিভোর্স দাও। আমি নতুন করে জীবন শুরু করব, সেটা কি অন্যায়?”
“না, কখনওই নয়। তোমার কথা যদি ঠিক হয়, কোর্ট অ্যাকশন নিতে বাধ্য।”
“বিয়ের পর আমার জীবনটা ছারখার হয়ে গিয়েছিল। আমি মেনে নিতে পারিনি, সারাটা জীবন এভাবে কাটাব। কেনই বা মানব বলো তো? আমি তো রক্ত মাংসের মানুষ। আমার জীবনে দেবোপম এসেছিল ঠিক সেই সময়। যে উদ্দেশ্য নিয়েই ও এসে থাক, আমার দিনগুলো কিছুটা আনন্দে ভরিয়ে দিয়েছিল। সায়ন কী করেছিল জানো? এই ব্যাপারটা জানার পরও দেবোপমকে তাড়ায়নি কোম্পানি থেকে বরং কাজে লাগিয়েছিল। গোপনে লোক লাগিয়ে আমাদের ছবি তুলে, কথাবার্তা রেকর্ড করে আমাকে ব্ল্যাকমেল করত এই বলে যে, ডিভোর্স আমি দেব না। বরং তুমি আমাকে চিট করেছ, এটা প্রমাণ করে জেল খাটাব। তোমার বাড়িকে সোসাইটিতে নিচু করে দেব।”
“কেন? এতে কী লাভ ওর?”
ম্লান হাসল শ্রাবন্তী, “আমি যে ওর তুরুপের তাস ছিলাম অপূর্ব। আমি ওর চেনা পলিটিক্যাল নেতাদের, বড়-বড় বিজ়নেসম্যানদের ‘সঙ্গ’ দিয়েছি কতবার। আমাকে সামনে রেখেই তো ও বড়-বড় সব ডিল তুলেছে মার্কেট থেকে।”
“কী বলছ কী?”
“এসব কিছুই হত না জানো, যদি ও দেবোপমকে মারতে না চাইত?”
“মানে? সায়ন তো বলল, তুমি আর দেবোপম মিলেই ওকে বিষ দিয়ে…”
হা হা করে হাসল শ্রাবন্তী। ছোট-ছোট দাঁতগুলো ঠোঁটের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে ঝিলমিল করে উঠল। বলল, “হ্যাঁ, ও সব জায়গায় তাই বলে। এক রাতে দেবোপমের ড্রিঙ্কের মধ্যে বিষ মিশিয়েছিল ও। কারণ মার্কেটে আমার আর দেবোপমের ব্যাপারটা ছড়িয়ে পড়েছিল। এতে ওর রেপুটেশন খারাপ হচ্ছিল।”
“দেবোপমের কী হল? মানে ওই বিষটায়?”
“দেবোপম ওই গ্লাসটা নেয়নি। কায়দা করে পালটে নিয়েছিল। তোমাদের সায়ন চালাক হলেও দেবোপমের চালাকিটা ধরতে পারেনি। বিষটা ওর নিজের শরীরেই চলে গিয়েছিল। প্রচণ্ড বমি করতে শুরু করেছিল ও। আমরাই হসপিটালে নিয়ে গিয়েছিলাম। ওয়াশ করে বের করা হয়েছিল সেই বিষ। পরে তো ও ভেলোরেও গিয়েছিল।”
“ও তো বলল সিঙ্গাপুর গিয়েছিল!”
“হবে হয়তো।”
“আর দেবোপম? ভালবাসত তোমায়?”
“হয়ত বাসত। তবে বেশিদিন ও থাকেনি আর। কেনই বা থাকবে? ডিভোর্সী মেয়েকে কেনই বা বিয়ে করবে? অমন ঝকঝকে ফ্রেশ ছেলে। দাগ তো কেবল মেয়েদের গায়েই লাগে, তাই না?’’ ম্লান শোনাল শ্রাবন্তীর গলাটা।
আমি ভাবতেও পারছিলাম না, যা শুনলাম সেটা সত্যি? কান ঝাঁ-ঝাঁ করছিল আমার।
“তবে সব পুরুষ সমান, এটা বলছি না কিন্তু। আমার এখানকার বস মানুষ হিসেবে খুব সেনসিটিভ। বয়সে অনেকটাই বড় আমার চেয়ে। অনেকদিন আগেই ওঁর স্ত্রী মারা গিয়েছেন, একটা মেয়ে আছে। মানুষটাকে, আমার বেশ ভাল লেগেছে। মেয়েটাও খুব সুইট, আমরা পরের মাসেই বিয়ে করছি। আসবে তো?” খুশি-খুশি লাগল শ্রাবন্তীর মুখটা এতক্ষণ পর।
“চেষ্টা করব। এই নাও আমার বিজ়নেস কার্ড। তোমার বিয়ের ডিটেলস আমাকে মেল করে দিও। এবার উঠব আমি। অফিস যেতে হবে। যোগাযোগ রেখো,” বলে উঠে পড়লাম।
শ্রাবন্তীও ওর কার্ড দিয়ে বলল, “হ্যাঁ, কিপ ইন টাচ।”
অফিসে এসেই অরিন্দমকে ফোন করলাম, “জানিস শ্রাবন্তীর সঙ্গে দেখা হল।”
“আচ্ছা?”
“সল্টলেকের দিকে একটা ব্যাঙ্কে আছে ও। অনেক কথা হল।”
“তাই? তা কী গল্প দিল?”
“গল্প? এরকমভাবে বলছিস কেন?”
“বল না, কী কথা হল?”
“আরে সায়ন তো আমাদের ঢপ মেরেছে রে! ওদের ভিতরে তো অনেক কেচ্ছা। আমি জানতামই না, বিষ খাওয়ানোর ব্যাপারটা নাকি ভাঁওতা। আসলে সায়নই নাকি কালপ্রিট?”
“শ্রাবন্তীর এই ঢপগুলো গিললি বসে-বসে?”
“একতরফা ভাবে ভাবাটা ঠিক নয় অরিন্দম।”
“ওরে গাধা তুই এই দু’টোকেই চিনিস না।”
“মানে?”
“মানে ও তোকে বসে-বসে মুরগি করেছে, আর তুই সেগুলো বিশ্বাস করেছিস।”
“হতেই পারে না, আমি চোখ দেখে বুঝতে পারি মানুষকে। শ্রাবন্তীর চোখ বলে দিচ্ছিল অনেককিছু।”
“আর সায়নের চোখ বলছিল না বুঝি?”
“না তা নয়…”
“শোন, এই দু’জনকেই আমি হাড়ে-হাড়ে চিনি। সায়ন শ্রাবন্তীকে ব্যবহার করে ফায়দা তুলতে গিয়েছিল। ভেবেছিল, ওর সুন্দর চেহারাটা সামনে ঝুলিয়ে মার্কেট করবে বিজ়নেস। কিন্তু শ্রাবন্তী আরও এককাঠি উপরে। সায়নকেই টেক্কা মেরে বেরিয়ে গিয়েছে।”
“কী বলছিস তুই?”
“শ্রাবন্তীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখিস না বেশি। বেকার ঝামেলা বাড়িয়ে কী লাভ?”

অপূর্বর ফোনটা রেখে অরিন্দম একটা সিগারেট ধরাল। সামনে বসে থাকা ছেলেটিকে বলল, “অপূর্বকে এই লিস্ট থেকে বাদ দাও দেবোপম। ভাল ছেলে।”
“ওকে বস, আপনি যা বলবেন,” হাসল দেবোপম।
“শ্রাবন্তীকে জানতে দিও না আমার সঙ্গে অপূর্বর কথা হয়েছে। বন্ধুত্ব বলে তো একটা ব্যাপার আছে নাকি?”
দেবোপম মুখে কিছু বলল না। এ লাইনে আবার বন্ধুত্ব! শ্রাবন্তীকে কাজে লাগিয়ে সায়নকে লুটে নেওয়ার বুদ্ধিটা তো অরিন্দমেরই ছিল। নেহাত ছোট্ট একটা বোকামির জন্য দেবোপম ধরা পড়ে গেল সেই দুপুরে। শ্রাবন্তীটাও তো বোকা। বেশ তো খাওয়াচ্ছিলে ওটা, সেই রাতে এতটা মেশানোর কোনও মানে হয়? শুধু-শুধু এই ব্যাপারটা নিয়ে এত হইহল্লা হয়ে গেল। যদি মরে যেত? ভাগ্যিস হয়নি তেমন কিছু। যাই হোক, যা হয়ে গিয়েছে আর ভেবে লাভ নেই। ব্যাঙ্কের বুড়োটার পাশাপাশি অপূর্বকে প্যাঁচে ফেললে মন্দ হয় না। যতই হোক, বিদেশ থেকে অনেক মাল্লু কামিয়েছে এ ব্যাটা। শ্রাবন্তীকে আজই বলতে হবে, পরের টার্গেট পেয়ে গিয়েছে ওরা। আবার কাজ শুরু করে দেওয়ার সময় চলে এসেছে। সব ব্যাপার কী আর বসকে বলা যায়? ওদের দু’জনের হিসেবটার কী হবে তা হলে?
“কী এত ভাবছ? কিছু বললে না?” অরিন্দম বলে উঠল মুখটা উঁচিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে-ছাড়তে।
“আপনি যা ভাল বুঝবেন স্যার,” বলে একটা ক্রূর হাসি হাসল দেবোপম।
যেটা অরিন্দম দেখতে পেল না।
 

ছবি: সৌমেন দাস