UnishKuri
Web-entertainment-2.jpg

  আজ ২১ ফেব্রুয়ারি।   
  স্কুলে-যাওয়া একটি ছেলেকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। সে কি জানে? তার উত্তর শুনলেন সুবর্ণ বসু ।  

ঘটনা ১ : আমার পাশের বাড়ির একটি ছোট্ট ছেলে। ক্লাস থ্রি। পরদিন বাংলা পরীক্ষা। সে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। বাংলা মোটেই পড়তে চায় না। ইংরেজি পড়তে পারে, ভালই পারে। ওয়ান টু হান্ড্রেড জানে। ‘একান্ন’ শুনলে বোকার মতো চেয়ে থাকে। এই তথ্যগুলো তার মা যখন সবার সঙ্গে শেয়ার করে, অভিব্যক্তিতে লজ্জা এবং দুঃখের সঙ্গে মিশে থাকে প্রচ্ছন্ন গর্ব।

ঘটনা ২ : এক বন্ধু। বাইরে পড়তে যাবে বলে ছোটবেলা থেকে দ্বিতীয় ভাষা হিন্দি। বাংলা পড়তে পারে না। লিখতেও নয়। অথচ নিকষ্যি বাঙালি। দক্ষিণ কলকাতার বালিগঞ্জে সাতপুরুষের বাস। ঠাকুরদাদা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা পড়াতেন। নাতিকে আঁকাড়া কনভেন্ট স্কুলে ভর্তি করানোর পরপরই একটা সেরিব্রাল অ্যাটাক হয়েছিল। কাকতালীয়ই হবে।

ঘটনা ৩ : ভাইপোর সঙ্গে খেলা করছিলাম ছুটির দিন। বউদি এসে ক্ষার এবং মধু মেশানো গলায় বলল, ‘‘এই শোনো, স্কুল থেকে বলে দিয়েছে বাড়িতে ইংরেজিতে কথা বলতে। নো আদার ল্যাঙ্গুয়েজ। স্ট্রিক্টলি ইংলিশ। কেমন?’’ বউদি চলে যায়। আমি রাস্তায় বেরোই। এই তিন নম্বর ঘটনা এখানেই শেষ নয়…

 আজ সকালে… 
রাস্তায় বেরিয়ে, স্কুলে যাচ্ছে এমন একটা ছেলেকে ধরে জিজ্ঞেস করেছিলাম, সে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস সম্বন্ধে কী জানে। সে আমাকে অবাক করে দিয়ে বলল, ‘‘১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ কলেজ আর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্ররা বাংলা ভাষাকে পূর্ব পাকিস্তানের দু’টি জাতীয় ভাষার একটি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি করেছিল। তখন সরকারি পুলিশ নির্বিচারে তাদের উপর গুলি চালায়। ভাষার জন্য আন্দোলন করে তাঁরা শহিদ হয়েছিলেন। তারপর ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো এই দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা দেয়।’’ অবাক হলাম। মনে হল, এখনও সব শেষ হয়ে যায়নি। আরও বিস্ময়কর ঘটনা হল, ছেলেটি একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ছাত্র। জেনারেল নলেজ বাড়ানোর দৌড়েই কি এই তথ্য জেনে রেখেছে! বুঝলাম না।

  প্রাণ আছে, এখনও প্রাণ আছে… 
কে যেন বলছিলেন, ‘‘ইংরেজিতে মোটে ২৬ টা বর্ণ। ড্যাম ইজ়ি। ওদিকে বাংলায়, এগারোটা ভাওয়েল ৪০টা কনসোন্যান্ট, কেন বাচ্চাগুলোর উপর চাপ বাড়াবি! আরে ভাই, জয়েন্ট আইআইটি পেতে বাংলা কোন কাজে লাগে!’’ মনে পড়ে গেল, আমরা ইংরেজি মাধ্যমে পড়িনি বটে, তবে বাংলা থেকে পালানোর প্রবণতা আমাদেরও ছিল। বাংলা মানেই পরীক্ষার আগে চোখ বুলনো আর স্টেজে মেকআপ। বাংলা কেউ পড়ছে না, বাংলা ভাষার পাঠক কমে যাচ্ছে বলে হা হুতাশ করার আগে নিজেদের দিকে তাকানো প্রয়োজন।
তবে খুব ধীরে ধীরে হলেও অবস্থা পালটাচ্ছে। বাংলায় লেখালিখি হচ্ছে, প্রতিবছরই উঠে আসছেন নতুন নতুন লেখক। ফেসবুকের মতো সোশ্যাল নেট ওয়র্কে বাড়ছে বাংলা কি বোর্ডে টাইপ করার প্রবণতা। ইংরেজি লেটার ব্যবহার করে দুর্বোধ্য কষ্টসাধ্য বাংলা লেখা কমছে। মানুষ বাংলা হরফ ব্যবহার করতে উৎসাহ পাচ্ছেন।
অনেকেই মনে রাখছেন যে, বাঙালি আগাগোড়া দ্বিভাষিক জাত। সাহেবি আমল থেকেই তাঁরা কাছা এঁটে সাহেববাবুদের হৌসে চাকরি করেছেন, গুছিয়ে ইংরেজি লিখেছেন, বাংলাও ভোলেননি। তাই বর্তমানে অনেক শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষই সাহেবি স্কুলে পড়ানোর পাশাপাশি বাংলার চর্চা রেখেছেন বাড়িতে। যে যা-ই করুক না কেন, একজন বাঙালি হিসেবে আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, ছোট্টবেলায় উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, সুকুমার রায়, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, তারপর বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় হয়ে সত্যজিৎ রায় অবধি না এলে শৈশব-কৈশোরের আসল মণিমুক্তোই কুড়নো হয় না সারাজীবন।

  অনস্বীকার্য ঋণ  
প্রথম ভাষা, যাতে আমরা আমাদের জন্মদাত্রীকে মা বলে ডাকতে শিখি, তা-ই মাতৃভাষা। সে ভাষার কাছে আমাদের আজীবনের ঋণ, তা কি কখনও ভোলা উচিত? তাই যদি সে ভাষা কোনও কারণে পিছিয়ে পড়ে, তা হলে এগিয়ে আসতে হবে আমাদেরকেই। আমাদের প্রতিবেশী কোনও দেশ যদি তাদের সব কিছু বাংলায় করে নিতে পারে, তা হলে আমরা পারি না? অতটা না হোক, আমরা সবাই মিলে তো অন্তত এটুকু করতে পারি যে, রোজ কোনও একটা বাংলা বইয়ের নতুন দু’চার পাতা পড়বই, একটা প্যারাগ্রাফ, সেটা ফেসবুকে হলেও বাংলায় লিখবই, তা হলেও কিন্তু অনেকটা এগনো যায়। দেরি না করে শুরু করো আজ থেকেই। শুধু কি ভ্যালেন্টাইনস ডে-র দিনটাতেই ভালবাসা জন্মায় আর মরে যায়? তা তো নয়। ঠিক তেমনই মাতৃভাষার প্রতি ভালবাসাও যেন এই একদিনের না হয়।

 ফের সকালের ঘটনাটা… 
ইংরেজি মাধ্যমে পড়া ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আন্তর্জাতিক ভাষাদিবস সম্বন্ধে সে এতকিছু জানল কী করে? সে হেসে বলল, ‘‘একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় সপরিবারে কলকাতায় চলে আসার আগে আমার মায়েরা বাংলাদেশেই থাকত। ঢাকায়। বাহান্ন সালের আন্দোলনে আমার মা-র বড়মামা শহিদ হয়েছিলেন। মা ছোটবেলায় আমায় বাংলা মাধ্যমে ভর্তি করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু বাড়ির চাপে হয়নি। মা আমাকে সমস্ত বাংলা গল্পের বই এনে দেন। ইংরেজির চেয়ে বাংলাই বেশি পড়ি। ইংরেজিটা ম্যানেজ হয়ে যায়।’’
দারুণ লাগল ব্যাপারটা। বাংলা মাধ্যমে ভর্তি করতে চেয়েও বাড়ির চাপে হেরে যাওয়া এক মা, আমাদের মাতৃভাষার মতোই, আসলে হেরে যাননি, হারিয়েও যাননি। ছেলেকে ঘিরে রেখেছেন মাতৃভাষা দিয়েই।

বাড়ি ফিরে আসি। দেখি জানালার রড ধরে দুলে দুলে ভাইপো গান গাইছে, ‘‘ওল্ড ম্যাকডোনাল্ড হ্যাড আ ফার্ম, ইয়া ইয়া ও…’’ চুপি-চুপি দরজা বন্ধ করে দিই। শুরু হবে গুপ্ত সমিতির বিপ্লব। ভাইপোকে কাছে টেনে বসাই, তারপর খুব ছোটবেলার স্মৃতি থেকে শুরু করি, ‘‘আমার সঙ্গে সঙ্গে বলো তো বাবাই, সেদিন ভোরে দেখি উঠে, বৃষ্টি বাদল গেছে ছুটে, রোদ উঠেছে ঝিলমিলিয়ে বাঁশের ডালে ডালে…’’
আমি এক লাইন, ও এক লাইন। কচি গলায় রবীন্দ্রনাথ ভেসে বেড়ান আমাদের ঘরে-বাইরে।