UnishKuri
web-to-new-banner.jpg

সেলফি

স্মরণজিৎ চক্রবর্তী

“তোর এই মোবাইলটা থেকেই আলেকজ়ান্ডার কি পুরুর সঙ্গে কথা বলেছিল?” বিটু বিরক্ত হয়ে তাকাল আমার দিকে, “এই যুগে কেউ এমন ফোন ইউজ় করে? সেই দু’হাজার দুই সালের মডেল! শালা, এটাকে মিউজ়িয়ামে দিয়ে দে আর তুইও তার পাশের কোনও কাচের বাক্সে ঢুকে বসে থাকিস। লোকে টিকিট কেটে দেখবে!”
আমি ভুরু কুঁচকে তাকালাম ওর দিকে। বিটু কখনওই ছোট সেনটেন্স বলতে পারে না। সবসময় ওকে রচনা লিখতে হবে।
আমি উত্তর না দিয়ে সামনে তাকালাম। ঘরের মাঝখানটায় ভিড় হয়ে আছে। মৌসেনাকে ঘিরে কোচিংয়ের সমস্ত ছেলে-মেয়ে জটলা করছে। করবেই। কমনওয়েল্‌থ গেম্‌স-এ দশ মিটার এয়ার পিস্তল বিভাগে সোনা জিতেছে যে! কলকাতার সমস্ত পেপারে ছবি বেরচ্ছে ওর। টিভিতে ওর আর ওর বাবা, মা, ঠাকুমা, কাজের দিদির ইন্টারভিউ থেকে শুরু করে বাড়ির কুকুরটারও ঘেউ-ও শোনানো হচ্ছে। মাত্র আঠারো বছর বয়সেই এত সাফল্য! সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের পর বাঙালির যে ডেসপারেটলি আর একটা আইকন দরকার, সেটা খুব বুঝতে পারছি। সাফল্য এমনিতেই পরিচিতি দেয় আর সুন্দরীদের সাফল্য আরও বেশি পরিচিতি দেয়। কেউ রাগ করলে করতে পারে, কিন্তু হার্ড ফ্যাক্ট এটাই!
আর মৌসেনা যেহেতু খুবই সুন্দরী, তাই ওর সাফল্যের ঝলকানিটা আরও বেশি করে ছিটকাচ্ছে!
আচ্ছা, আমার কথা শুনে কি তোমাদের কোথাও মনে হচ্ছে যে, আমি সিনিক বা জেলাস? মনে হলে, ঠিকই মনে হচ্ছে। আমার জ্বলছে। নেহাত এসব আগুনের জন্য দমকল ডাকা যায় না। গেলে মিনিমাম দু’শো গাড়ির ফোর্স আনতে হত।
যে মেয়েটাকে দেড়মাস আগে আমিই শুধু দেখতাম আর মনে-মনে সলতে পাকিয়ে ভাবতাম, এই গেম্‌সটা থেকে ফিরলেই বুক ঠুকে মনের কথাটা বলেই দেব, সে কিনা এক নিমেষে অন্য গ্যালাক্সির বাসিন্দা হয়ে গেল! এখন ওর কাছে যাওয়ার মতো স্পেস শাটল তো দূরের কথা, ওকে দেখার মতো দামি টেলিস্কোপও আমার নেই।
আমি দেখলাম, গোটা কোচিংয়ের ছেলে-মেয়েগুলো ওর সঙ্গে নিজের-নিজের মোবাইলে সেল্‌ফি তোলার ধুম লাগিয়ে দিয়েছে। আর গোটা মবটা কন্ট্রোল করছে আমাদেরই সঙ্গে কোচিং নিতে আসা মামিক। ওর ভাবটা এমন যেন মৌসেনা ওর বাবার সম্পত্তি!
বিটু বলল, “কী রে, তুই তুলবি না?”
বিটু জানে, আমি মৌসেনার সম্বন্ধে কী ফিল করি। তাই ওর কথার ভিতরের ছোট্ট পিনটা ধরতে পারলাম। বললাম, “না, সেল্‌ফি খুব সেল্‌ফিশ ব্যাপার।”
বিটু হাসল, “খোকা, নাগালের বাইরের আঙুরের টেস্টটা যেন কেমন! এমন ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট টিভি টাইপের মোবাইলে সেল্‌ফি ওঠে? শোন, যখন যাকে তোলার, তখন না তুললে এমনভাবেই তাকিয়ে দেখবি যে, অন্য কেউ সবটা তুলে নিয়ে গেল। বুঝেছিস?”

¶ ২ ¶

বুঝলেও কী করব? আমি তো সলতে পাকাচ্ছিলামই। কে বলেছিল মৌসেনাকে দুম করে ফার্স্ট হয়ে যেতে? কে বলেছিল অমন টিপ করতে? এখন দিল তো আমার টিপটা ফসকে!
মউকে আমি চিনি সেই ক্লাস নাইন থেকে। আমাদের পাড়ার সবচেয়ে বড় বাড়িটা ওদের। আমাদের টিনের চালের বাড়ির পিছনের একফালি বারান্দার কোণের পেঁপে গাছটার ফাঁক দিয়ে, ওদের চারতলা বাড়ির মাথার কাচের ঘরটা দেখা যায় (ওহ, কী সেনটেন্স! বিটুর প্রভাব)।
ও অত বড় বাড়ির মেয়ে আর আমি রিফু করা ছাতার মতো পরিবার থেকে এসেছি। মা নেই। বোন আর আমাকে নিয়ে বাবার সংসার। বাবা হাওড়ার একটা ফ্যাক্টরিতে লেদ মেশিন চালায়। ক্লাসিক লাভ স্টোরির থিম আর কী!
তবে আমাদের কোনও কষ্ট হতে দেয় না বাবা। আমি আর বোনও মন-প্রাণ দিয়ে লেখাপড়া করি। জয়েন্টে ভাল র্যাঙ্ক করতে আমার কোনও সমস্যা হয়নি। ভাল কলেজেই ইলেকট্রনিক্সে চান্স পেয়ে গিয়েছি। আসলে আমি জানি, মউয়ের কাছে পৌঁছতে গেলে আমাকে নিজেকে যোগ্য করে তুলতে হবে। ভাল রোজগার করতে হবে। এখনও সমাজ মনের আগে টাকা-পয়সাকেই রাখে।
আমি সেই ক্লাস নাইন থেকেই মউয়ের সঙ্গে এক টিউশনে পড়ি। মউ নিজেও লেখাপড়ায় খুব ভাল। আমাদের কলেজে ও আমার স্ট্রিমেই ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে। আসলে এই সবকিছুকেই আমি ভগবানের সিগনাল হিসেবে দেখেছি। মানে, ক্লাস নাইন থেকে আমরা দু’জন একসঙ্গে এগোতে-এগোতে ইঞ্জিনিয়ারিংয়েও একসঙ্গে! অর্থাত্‌ ঈশ্বরও চান আমরা এক হয়েই থাকি।
তাই আমি এবার ঠিক করেছিলাম, ও কমনওয়েল্‌থ গেম্‌স থেকে ফিরলেই আমি ওকে বলব। কারণ, এক টিফিনবক্স থেকে টিফিন খাওয়া, এক ছাতায় বৃষ্টি পেরনো থেকে শুরু করে নিজের চকোলেট আমার বাড়ি এসে ভাগ করে ও নিজের থেকেই খেয়েছে কতবার। সেসব কি শুধু বন্ধু বলেই? আমার সঙ্গে কি ওর একদিনের সম্পর্ক?

¶ ৩ ¶

“একদিনই যথেষ্ট বুঝলি, জীবন পালটে যেতে একটা দিনই যথেষ্ট,” বিটু কথাটা বলে আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে এগিয়ে গেল জটলার দিকে।
আমার ইচ্ছে ছিল না, কিন্তু লম্বা-চওড়া বিটুর জোরের সঙ্গে পেরে উঠলাম না।
আমাকে দেখে মামিক হাসল। বলল, “কী রে, তুইও ছবি তুলতে এসেছিস নাকি? তোর ওটায় তো ক্যামেরা নেই। তবে? ফোকাস করবি কী দিয়ে?”
মামিক এমন করে কথাটা বলল যে, আশপাশে সবাই খিলখিল করে হেসে উঠল। আমি দেখলাম মৌসেনা ভিড়ের মাঝখান থেকে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
ও গত পরশু ফিরেছে কলকাতায়। তারপর থেকে আমার সঙ্গে একটাও কথা বলেনি। জানি, আর বলবেও না হয়তো। কাচের ঘরটা পেঁপে গাছ থেকে অনেক দূরে যে!
বিটু কড়া গলায় বলল, “ও আমার ফোন থেকে সেল্‌ফি তুলবে। তোর আপত্তি আছে?”
মামিক বিটুকে ভয় পায়। তাই থমকে গিয়ে জায়গা করে দিল সামনে। তবে মুখের হাসিটা ঝুলিয়েই রাখল।
বিটু নিজের মোবাইলটা বের করে আমাকে দিয়ে বলল, “যা, তোল ছবি।”
“না,” মৌসেনার নরম গলাটা এই প্রথম পেলাম আমি। ও বলল, “তুলব না।”
“তোর সঙ্গে এখন আমাকে ছবিও তুলতে হবে! আমি ছবি তুলতে আসিনি,” কথাটা রাগের সঙ্গে ছিটকে বেরল আমার মুখ থেকে। মউ সকলের সামনে এমনটা বলতে পারল!
মউ কিছু না বলে এগিয়ে এল এবার। তারপর আচমকা আমার হাত ধরে টেনে নিজের কাছে নিয়ে বলল, “বলছি, বিটুর মোবাইলে তুলব না। তোর সঙ্গে আমি আমার মোবাইলে তুলব, সেল্‌ফি। রেখে দেব তোকে আর তোর ছবিকে। আয়। আর একটু হাস এবার। প্লিজ়!”
সেল্‌ফি যতই সেলফিশ ব্যাপার হোক, আসলে ততটাও খারাপ জিনিস নয়…

 

ছবি: রৌদ্র মিত্র