UnishKuri
web-to-new-banner.jpg

লং ড্রাইভ

বিতান সিকদার

সকাল সাড়ে ছ’টা
শুভ্র মেসের বাথরুম থেকে স্নান করে বেরোনোর পর অরিত্র তাকে দেখে জিজ্ঞেস করল, “চোখ লাল কেন রে? ঘুমোসনি?”
“না।”

সকাল আটটা পঁচিশ
ট্রেন বিধাননগরে ঢুকছে। গাদাগাদি ভিড়। গুমোট গরম। এক যাত্রী অপর যাত্রীকে বলছেন, “রোজই কালো করে আসছে, কিন্তু…”
শুভ্র দরজার বাইরে ঝুলছিস। সে বিড়বিড় করে, “আর হয়েছে!”
শুভ্র চট্টোপাধ্যায়, মনে প্রাণে কার্টুনিস্ট হলেও গতজন্মের পাপক্ষয় করতে এ জন্মে সল্টলেকের এক আইটি ফর্মে সিস্টেম অ্যাডমিনিস্ট্রেটারের কাজ করছে বছর দুয়েক। এবার প্রায়শ্চিত্ত শেষ। আজ অফিসে শুভ্রর শেষ দিন। যদিও, তার মুখ জুড়েও মেঘ করে রয়েছে।

সকাল ন’টা বাজতে পাঁচ
হাডকো মোড়। অফিসের গাড়ি দাঁড়িয়ে। সিগারেট শেষ টানটা দিয়ে শুভ্র টুকরোটা এমনভাবে রাস্তায় ছুড়ল যে, ফকির দেখলেই বলত, “কেয়া বাত! জিসে ফেকনা, অ্যায়সে হি ফেক দেনা।”
সে গাড়িতে উঠে দেখে লাস্ট সিটে অমৃতা বসে রয়েছে। মুখ জুড়ে সকালবেলার আলো।
তখনই, এক ঝলক হাওয়া ধেয়ে আসে দক্ষিণ দিক থেকে। ফকির সবসময় বলে, “দেখ বাচ্চা! জো করনা হ্যায়, অভি কর ডাল!”
করে দেবে? বলে দেবে, কাল থেকে আর দেখা হবে না! শেষ হয়ে আসা সিগারেটের মতো অমৃতাকেও সে একইভাবে ছুড়ে ফেলে দেবে?
বাইপাস। অমৃতা বলে, “আমার সঙ্গে লং ড্রাইভে যাবি একদিন?”
“ঋতম জানে?”
“তুই সবসময় ওর কথা তুলিস কেন? ব্রেকফাস্ট করেছিস?”
শুভ্র হাসে। অমৃতা বলে, “আর কতভাবে জ্বালাবি আমায়?” সে ব্যাগ থেকে টিফিনবক্স বের করে। আর এক সময় অফিস চলে আসে।
বাস থেকে নেমে অমৃতা শুভ্রকে জিজ্ঞেস করে, “সকালটা এমন কেন শুভ্র?”
“আমি আজ চাকরি ছেড়ে দিচ্ছি অমৃতা।”
গুমোট ভাবটা চেপে বসে। অমৃতা কিছুক্ষণ শুভ্রর মুখের দিকে চেয়ে থাকে, “ও!” তারপর এগিয়ে যায়।
অমৃতা দস্তিদার। ঋতম নামের কোনও এক বিলেতফেরত ইঞ্জিনিয়ারের বাগদত্তা। অমৃতাকে বাড়ি থেকে বলা হয়েছে, ঋতম ভাল ছেলে।
অমৃতা মেনে নিয়েছে, ঋতম ভাল ছেলে।
অফিস ঢোকার মুখে শুভ্র দেখে ফকির দারোয়ানের সঙ্গে কথা বলছে। শুভ্রকে দেখে হাসে, “কিঁউ। উড় চলা?”

বেলা দশটা পঞ্চান্ন
কাজে মন বসছে না। এইভাবেই পরিসমাপ্তি আসে? বোধ হয়! তিলে-তিলে মরার চেয়ে একেবারে চলে যাওয়া ভাল। ‘ডেজ়িগ্‌নেটেড স্মোকিং জ়োন’-এ এসে শুভ্র সিগারেট ধরায়।
সে কখনও অমৃতাকে জিজ্ঞেস করেছিল, “আমায়…?”
“বাসি তো!”
“তা হলে…”
“লক্ষ্মীটি, আর কিছু জিজ্ঞেস করিস না!”
এটা ঠিক যে, অমৃতার সঙ্গে ঋতমের বিয়ে ঠিক হয়ে গিয়েছে। তারপরও শুভ্র অফিসে তিনবার হাঁচলে সে সন্ধেবেলা তাকে ফোন করে, “ডক্টরের কাছে গেলি?”
এ অপরিণত আশা এখানেই শেষ হোক। সিগারেটটা নিভিয়ে ফেলে সে।
অ্যাকাউন্টসের দীপ তাকে কখনও বলেছিল, “শালা, মরবি তুই!”
মৃত্যু? শুভ্র সেদিনই মরে গিয়েছিল যেদিন অমৃতার কানের ঝুমকোটা চুলে জড়িয়ে গিয়েছিল। শুভ্রকে সেটা ছাড়িয়ে দিতে হয়েছিল।
তিরতির করা… দু’জোড়া ঠোঁট।
দীপের কথাটা শুনে শুভ্র তাই বলেছিল, “বেঁচে আছি এখনও?”
সে কেবিনে ফিরে আসে। আজ অমৃতা একবারও এদিকে আসেনি।
অনেকদিন আগে শুভ্রকে ঋতমের কথা জানিয়ে সে জিজ্ঞেস করেছিল, “আমায় ছেড়ে চলে যাবি না তো?”
সেদিন খুব বৃষ্টি পড়েছিল।

দুপুর সাড়ে বারোটা
ঝেঁপে বৃষ্টি হচ্ছে। সবার চিন্তা অফিসের সামনের গর্তে ভরা রাস্তাটা জলে ডুবে গেলে পার হবে কী করে! গেলবার এইচআর-এর সমদর্শী এমনই এক গর্তে পড়ে মালাইচাকি ভেঙে দু’মাস হাসপাতালে পড়ে ছিল। নিন্দুকে বলে, ‘স্বপ্নের কর্মনগরী!’
সবাই যখন রাস্তায় চিন্তায় আটকে, শুভ্র তখন অফিস চ্যাট-এ লগ ইন করে। মেসেজ পাঠায়, “কী করছিস?”
“কাজ।”
“একবারও এলি না এদিকে?”
ওপাশ থেকে রিপ্লাই আসে না।

দুপুর পৌনে দুটো
ক্যান্টিন। শুভ্র আর অমৃতা সামনাসামনি বসে লাঞ্চ করছে। চুপ-চুপ পরিস্থিতি। খাওয়ার পর অমৃতা বলে, “লক্ষ্মীছেলে হয়ে থাকিস।”
“আর?”
“…কথায়-কথায় জেদ করিস না।”
“আর?”
অমৃতা উঠে হাত ধুতে চলে যায়।
শুভ্র একলা বসে ভাবতে থাকে, এটা একসময় ঘটারই ছিল। আটকানো যেত না। বিলেতফেরতের প্রচুর দাপট। সে কেবিনে ফিরে আসে। জানালার পরদা সরিয়ে দেখে ফকির রাস্তার ধারের ঝুপড়িটাতে বসে তার দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ছে। বৃষ্টি দেখিয়ে বোঝায়, “সব ধুল জায়েগা!”
ওই ঝুপড়িটার একটু দূরেই কখনও-সখনও ছুটির সময় ঋতম এসে দাঁড়ায়। তখন অমৃতা ফ্যাকাশে মুখ করে শুভ্রকে বলে,“আজ আর বাসে ফিরব না। ও নিতে এসেছে।”

দুপুর তিনটে
বৃষ্টি পড়ে চলেছে। শুভ্র বিড়বিড় করে, “যা হয়েছে ভালই হয়েছে!”
হবে নাই বা কেন? শুভ্র টফি হলে ঋতম চকোলেট বার। মাসখানেক আগে একবার ম্যানেজমেন্ট সবাইকে টফি দিয়েছিল। অমৃতা সেদিন অফিসে আসেনি। শুভ্র তার জন্য একটা নিজের কাছে রেখে দিয়েছিল। পরের দিন বাসে আসতে-আসতে বলেছিল, “একটা জিনিস খাবি?”
শুনে অমৃতা নিজের ব্যাগ থেকে একটা বড় চকোলেট বার বের করে শুভ্রকে বলেছিল, “ফার্স্ট, ইউ টেক আ বাইট… কাল ঋতম কিনে দিয়েছে।” তারপর শুভ্রর কাছে হাত পেতেছিল, “এবার দে?”
আর শুভ্র পকেট হাতড়ে অভিনয় করেছিল, “যাহ্‌, আনতে ভুলে গিয়েছি।”
সে কখনও অমৃতাকে বলত, “সামনের জন্মে বিলেতফেরত হব…” অমৃতা একবার একথার রেশ টেনে বলেছিল, “আমায় বোধ হয় বিয়ের পর ইউকে চলে যেতে হবে। বলছে ওখানে কিছু জয়েন করতে।”
“ভাল!”
“কিন্তু আমার তো…”
তারপর একদিন। অমৃতা বলেছিল, “আমি ওদের কাছে বোধ হয় টেকেন ফর গ্রান্টেড। বলছে শাড়ি পরা প্র্যাকটিস করো।”
“ঋতম?”
“না, ওর বাড়ির লোক।”
তারপর আরও একদিন। গভীর রাতে অমৃতার ফোন এসেছিল, “আমার ভীষণ একা লাগছে শুভ্র…”
পরদিন বাসে শুভ্র জিজ্ঞেস করেছিল, “কী হয়েছে?”
অমৃতা চুপ করে বসে ছিল। একটা সময় শুভ্রর হাতটা চেপে ধরে অস্ফুটে বলেছিল, “জানিস, সেদিন ও আমায় একটা হোটেলের সামনে নিয়ে গিয়ে বলেছিল সেখানে নাকি ঘর বুক করে…”
“থাক,” শুভ্র চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছিল, “আর বলতে হবে না।”

বিকেল পৌনে ছ’টা
আজ কি শেষবারের মতো একসঙ্গে অফিসের বাসে ফেরা? চ্যাট মেসেজটা ঠিক সেই সময় এল, “আজ বাসে ফিরব না। ও নিতে…”
শুভ্র জানালা দিয়ে দেখে বৃষ্টি ধরে এসেছে। কিন্তু সামনের রাস্তাটা জলে ঢাকা। সে রিপ্লাই করে, “সামনেটা সাবধানে পার হোস। জলে ঢেকে আছে। উপর থেকে কিছু বোঝা যাচ্ছে না।”
তারপর লেখে, “আসি?”
উত্তর আসে, “ভাল থাকিস!”

সন্ধে ছ’টা দশ
অফিসের বাস বড় রাস্তায় দাঁড়িয়ে। সবাই হাঁটুজল ডিঙিয়ে উঠছে। শুভ্র শেষ সিটে একলা বসে। যা হয়েছে, বেশ হয়েছে। এটাই হওয়ার ছিল। এরপর যা হওয়ার হোক। বোধ করি আর কিছু হারানোর নেই।

সন্ধে ছ’টা এগারো
ড্রাইভার : এসেছে সবাই?
জনৈক : একজন বাকি।
শুভ্র : আসবে না।
সামনে জ্যাম লেগে রয়েছে। বাস বেরোবার চেষ্টা চালাচ্ছে।

সন্ধে ছ’টা পনেরো
জ্যাম কেটে গিয়েছে। বৃষ্টি থেমে গিয়েছে।
আকাশ আর রাস্তা, দুটোই পরিষ্কার।
আর শুভ্রর ফোন বাজছে। অমৃতা।
“হ্যালো!”
“আমি এখানে আটকে পড়েছি শুভ্র। বিল্ডিংয়ের নীচে। সবাই চলে গিয়েছে… আমি বেরতে পারছি না।”
“মানে? বললি যে ঋতম…”
“এখন বলছে, এত জল ভেঙে আসতে পারবে না।”
“সে আবার কী?”
“আমার ভীষণ…”
শুভ্র ফোন কেটে দেয়।

যখন চাঁদ উঠল
জলে ভর্তি গলির মুখে একটা ছেলে এগিয়ে আসে। গলির ওই প্রান্তে এক বিল্ডিংয়ের নীচতলায় একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। ছেলেটা ট্রাউজ়ার্স গুটিয়ে উপরে তোলে। তারপর জলে নামে।

ছবি : দীপঙ্কর ভৌমিক